Friday, June 24, 2022

উচ্চ রক্তচাপ ও চর্বি কমাতে পারে সরিষার তেল

 শরীরের উচ্চ রক্তচাপ ও চর্বি কমিয়ে দিতে পারে সরিষার তেল। এর ব্যবহারে কার্ডিওভাস্কোলার রোগগুলোও কমে যেতে পারে। কারণ এ তেলে রয়েছে মনোআনস্যাচুরেটেড (একক অসম্পৃক্ত) ফ্যাটি এসিড। বাংলাদেশে হাজার বছর থেকে সরিষার তেল ভোজ্যতেল হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছিল। দেশের সত্তর ঊর্ধ্ব ব্যক্তিরা এখনো বলেন, তাদের ছেলেবেলায় ভোজ্যতেল হিসেবে সরিষার তেল খাওয়া ছাড়াও নানা ধরনের ওষুধে সরিষার তেল ব্যবহার হতো। কিন্তু স্বাধীনতার পর হঠাৎ করে সরিষার ব্যবহার কমে যায়। চলতি শতকের শুরু থেকেই বাংলাদেশে যে হারে হৃদরোগী ও উচ্চ রক্তচাপের রোগী বেড়েছে আগে এত বেশি মানুষের এ রকম রোগ হতো না।

গবেষণা রিপোর্টে দেখা যায়, সরিষার তেলে অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডের পরিমাণ ৬৫ থেকে ৭২ শতাংশ এবং সম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডের পরিমাণ ৬ থেকে ১০ শতাংশ। এ তেলে আরো কিছু অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড রয়েছে, যেগুলোর পরিমাণ বাংলাদেশে এখন বহুল ব্যবহৃত সয়াবিন তেলে মনোআনস্যাচুরেটেড বা অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডের পরিমাণ অনেক কম। ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তিরা এখন বলছেন, অসত্য কিছু প্রচারণার কারণে বাংলাদেশে সরিষার তেলের উৎপাদনে ধস নামে এবং তেলের চাহিদা মেটানোর জন্য আমদানি হতে থাকে সয়াবিন তেল। ফলে বাংলাদেশে কার্ডিওলজির রোগী বাড়তে থাকে। ৮০ ও ৯০-এর দশকেও বাংলাদেশে হাতেগোনা কয়েকজন কার্ডিওলজিস্ট ছিলেন। এখন সময়ের ব্যবধানে শত শত কার্ডিওলজিস্ট বেড়েছে। কারণ কার্ডিওলজির রোগী বেড়েছে কয়েক গুণ। একবার কেউ কার্ডিওলজি সমস্যায় ভুগলে তা থেকে স্থায়ী মুক্তি পাওয়া যায় না; সারাজীবনই ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যেতে হয় বেঁচে থাকতে।
গবেষণা জার্নাল থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যাচ্ছে, সয়াবিন তেলে সম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডের পরিমাণ প্রায় ১৫ শতাংশ, মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিডের পরিমাণ ২২ থেকে ২৩ শতাংশ। ফলে সয়াবিন তেলের চেয়ে সরিষার তেল অনেক স্বাস্থ্যকর। কারণ এতে কেমিক্যাল প্রসেস করতে হয় না, যা সয়াবিনে অবশ্যম্ভাবী। আগেতো কাঠের ঘানিতে সরিষার তেল ভাঙ্গানো হতো। এখন মেশিনের সাহায্যে ভাঙ্গায় কিন্তু এতে কোনো ধরনের রাসায়নিক প্রসেস করতে হয় না। তবে অসাধু ব্যবসায়ীরা বেশি মুনাফার লোভে বাজারের সস্তা পামঅয়েল অথবা মেশিন অয়েল ব্যবহার করে সরিষার তেলের পরিমাণ বাড়ায় এবং এতে গন্ধ যোগ করার জন্য কেমিক্যাল মেশানো হয়। এ ধরনের সরিষার তেল স্বাস্থ্যের জন্য অবশ্যই ক্ষতিকর।
অপর দিকে সয়াবিন তেলে থাকা দুর্গন্ধ দূর করার জন্য অবশ্যই কমিক্যাল প্রসেস করতে হয়। অর্গানিক সয়াবিন তেল বাজারে প্রাপ্ত তেলের মতো পাতলা নয়, ভারী। সয়াবিন বীজ থেকে প্রাপ্ত এই ভারী তেলকে কেমিক্যাল মিশিয়ে পাতলা ও দুর্গন্ধ মুক্ত করতে হয়। সেই কেমিক্যাল থেকেই সয়াবিনের ক্ষতিকর দিক চলে আসে। আর সেই সয়াবিনকে সোনালি রঙ দিতে আরো কিছু কেমিক্যাল যোগ করতে হয়।
তেলের এ বিষয়টি নিয়ে নয়া দিগন্তের সাথে কথা বলেছেন বারডেমের প্রধান পুষ্টিবিদ শামসুন নাহার মহুয়া। তিনি বলেন, সরিষার তেলে অন্যান্য তেলের চেয়ে আড়াই গুণ বেশি ভালো ফ্যাট রয়েছে, যা হার্টের জন্য খুবই ভালো। অন্য দিকে সরিষার তেলের তাপ গ্রহণের ক্ষমতা বেশি। ফলে সরিষার তেলে অন্যান্য তেলের চেয়ে ট্রান্সফ্যাট কম হয়ে থাকে (ট্রান্সফ্যাট হার্টের বা হৃৎপিণ্ডের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই খারাপ এবং খুব সহজেই হার্টের ভেতর চর্বি জমিয়ে দেয়, যা সহজে গলে না এবং বেশি জমলে হার্ট অ্যাটাক হয়ে থাকে)। অপর দিকে সরিষার তেলে মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি থাকে বলে তা হার্টের জন্য ভালো। শামসুন নাহার মহুয়া আরো বলেন, সবচেয়ে ভালো হয় ঘানিতে ভাঙ্গানো সরিষার তেল। এতে কোনো কেমিক্যাল মেশানো হয় না।
সরিষার তেল খেলে রিউম্যাটিক ফিভার হয়ে থাকে এমন একটি প্রচারণা রয়েছে। সে সম্বন্ধে মতামত জানতে চাইলে পুষ্টিবিদ শামসুন নাহার মহুয়া বলেন, আমিও শুনেছি, তবে এ পর্যন্ত কোনো গবেষণায় এসব পাইনি। তিনি বলেন, কেমিক্যাল প্রসেস না হলে সব ধরনের তেলই স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী, ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ এটা চর্বি হয়ে না যায়। চর্বি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
বাংলাদেশে আগে সরিষার তেলের পাশাপাশি গরুর দুধ থেকে কিছু ঘি উৎপাদন হতো। বহু জাতিক কোম্পানিগুলো গরুর তৈরি ঘির বাজারটি ধ্বংস করার জন্য চালানো নানা ধরনের প্রচারণায় সে বাজারটিও ধ্বংসের পথে। এর পরিবর্তে বাটারঅয়েল আমদানি করা হয়েছে এবং বাটারঅয়েলের চমৎকার বিজ্ঞাপনে মুগ্ধ হয়ে মানুষ সেটি ব্যবহারে আকৃষ্ট হচ্ছে।
বাংলাদেশ জার্নাল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চের ‘স্টাডিজ অব ফ্যাটি এসিড কম্পোজিশন অব এডিবল অয়েল’ শীর্ষক গবেষণায় কে চৌধুরী, এল এ বানু, এস খান, এ লতিফের যৌথ গবেষণায় সরিষার তেলে মনো অ্যান্ড পলিআনস্যাচুরেেেটড ফ্যাটি এসিড রয়েছে ৮৬.৮০ শতাংশ। সূর্যমুখী তেলে রয়েছে ৯১.৪৯ শতাংশ। ভারতের জিবি প্যান্ট ইউনিভার্সিটি অব অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির হিনা ধাইনিক, এইচ পুনেথা, ওম প্রকাশের যৌথ গবেষণায় দেখানো হয়েছে, সরিষার তেলে মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিডের পরিমাণ ৬০ থেকে ৬১ শতাংশ পাওয়া গেছে।


শেয়ার করুন

0 comments: